নিজস্ব প্রতিবেদক:
গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার টেংড়া গ্রামের বেকাসাহরা পাড়ায় এক কিশোরীর জীবন কাহিনি আজ মানুষের চোখে জল এনে দিয়েছে। নাম তার তায়েমা আক্তার রূপসী। ছোটবেলা থেকেই দুর্ভাগ্য যেন তার ছায়াসঙ্গী। বাবা রোমান মিয়া মারা যান যখন রূপসী ছিল একেবারেই ছোট। সংসারের ভার এসে পড়ে তার মা ফেরদৌসীর কাঁধে।
মা ফেরদৌসীকে বাঁচতে হয়েছে শুধু নিজের জন্য নয়, তার একমাত্র মেয়ের ভবিষ্যতের জন্যও। দিনের পর দিন মানুষের বাড়িতে কাজ করেছেন, কখনো ছোটখাটো চাকরিও করেছেন। নিজের খাওয়া বাদ দিয়ে মেয়ের পড়াশোনার খরচ জুগিয়েছেন। চারপাশের মানুষ তাকে বারবার বলেছেন, ‘একটা মেয়ে মানুষকে এত কষ্ট করে পড়াশোনা করিয়ে কী হবে?’ কিন্তু ফেরদৌসী হার মানেননি।
তার সেই লড়াইয়ের ফসল হলো—২০২৫ সালে আলহাজ্ব নয়াব আলী আদর্শ উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেছে রূপসী। কিন্তু পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার আনন্দ বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। নতুন সংকট দেখা দিল-কলেজে ভর্তির টাকা নেই।
এমন সময় খবরটি পৌঁছে যায় প্রবাসী এস এম মিল্টন সরকারের কানে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে দেশের বাইরে থাকলেও গ্রামের খোঁজ-খবর রাখেন। বিএনপির সাবেক আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ও জাতীয়তাবাদী যুবদলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির প্রাক্তন নেতা মিল্টন সরকার এই খবর শোনামাত্র সিদ্ধান্ত নেন-এই এতিম মেয়েটির পড়াশোনা থেমে যেতে দেওয়া যাবে না। তিনি নিজের দায়িত্বে রূপসীর ভবিষ্যৎ শিক্ষার ব্যয়ভার গ্রহণ করেন।
অবশেষে ৭ সেপ্টেম্বর, রবিবার রূপসীর স্বপ্নপূরণের নতুন অধ্যায় শুরু হয়। গাজীপুরের শ্রীপুর সরকারি কলেজে একাদশ শ্রেণিতে তার ভর্তি সম্পন্ন করা হয়। দীর্ঘদিনের সংগ্রামের পর মা-মেয়ের চোখে ভেসে ওঠে আনন্দাশ্রু। এ সময় আশিকুল ইসলাম পিয়াল যুগ্ম আহ্বায়ক, গাজীপুর জেলা গণসংহতি আন্দোলন, ও আহ্বায়ক, শ্রীপুর উপজেলা গণসংহতি আন্দোলন তিনি সাথে থেকে ভর্তির কাজ সম্পন্ন করেন।
মা ফেরদৌসী বলেন, আমি ভেবেছিলাম মেয়ের পড়াশোনা এখানেই থেমে যাবে। কিন্তু মিল্টন সাহেব আল্লাহর রহমতের মতো এগিয়ে এলেন। আজ আমি নিশ্চিন্ত, আমার মেয়ে আবারও নতুন স্বপ্ন নিয়ে পড়াশোনা শুরু করতে পারবে।
রূপসী নিজের স্বপ্নের কথা বলতে গিয়ে কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে। সে বলে,
আমার মা আমার জন্য কত কষ্ট করেছেন, আমি জানি। আমি চাই ভালো একটা চাকরি করে মাকে সুখে রাখব। যাতে আর কোনোদিন তাকে মানুষের বাড়িতে কাজ করতে না হয়। আমি শুধু চাই আমার মাকে সেবা করতে।
এস এম মিল্টন সরকার মুঠোফোনে বলেন, রূপসীর গল্প আমাকে নাড়া দিয়েছে। দেশে হাজারো রূপসী আছে, যারা শুধু অভাব আর অনাথ হওয়ার কারণে পড়াশোনা বন্ধ করে দেয়। আমি চেয়েছি অন্তত একজনকে সাহায্য করতে, যাতে সে নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে পারে। আমি বিশ্বাস করি, রূপসী একদিন বড় মানুষ হবে এবং সমাজে আলো ছড়াবে।
আজ তায়েমা আক্তার রূপসী আর একা নয়। তার চোখে এখন ভবিষ্যতের স্বপ্ন, মায়ের চোখে আশা। সমাজও বিশ্বাস করছে, এমন উদ্যোগ বাড়লে আর কোনো এতিম মেয়েকে দুঃখের গল্প লিখতে হবে না।